জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘বালিকা বধূ’র মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া বাঙালি অভিনেত্রী প্রত্যুষা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণের ঘটনায় দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর একটি বড় আইনি মোড় এসেছে। ঘটনার প্রায় এক দশক পার হওয়ার পর, মুম্বাই হাইকোর্ট এই মামলায় বড় ধরনের রায় প্রদান করেছেন। প্রত্যুষাকে আত্মহত্যার দিকে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত তাঁর প্রেমিক ও প্রযোজক রাহুল রাজ সিংকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। গত বুধবার আদালত এই রায় ঘোষণা করেন, যা বহু আলোচিত এ ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি ঘটাল। সেই ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর গুরুত্বপূর্ণ রায় দিলেন মুম্বাই হাইকোর্ট। এই একটি চরিত্রই তাঁকে ভারতজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই হিন্দি টেলিভিশনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন প্রত্যুষা।
২০১৬ সালের ১ এপ্রিল মুম্বাইয়ের গোরেগাঁও পশ্চিমের নিজ ভাড়া বাসা থেকে প্রত্যুষার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশের তদন্তে বিষয়টিকে আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে রাহুল রাজ সিংয়ের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। প্রত্যুষার বাবা-মা অভিযোগ করেছিলেন যে, রাহুলের মানসিক নির্যাতনের কারণেই তাঁদের মেয়ে এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় এই অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলাটি চলে আসছিল। প্রত্যুষার মা–বাবার অভিযোগ ছিল, রাহুল তাঁদের মেয়েকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।
তবে মামলার নথি এবং উপস্থাপিত সব প্রমাণ পর্যালোচনা করার পর মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতি এস জি ডিজে পর্যবেক্ষণ করেন যে, রাহুলের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ নেই। আদালতে রাহুলের আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, কোনো সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি এবং মামলার এফআইআর তড়িঘড়ি করে দায়ের করা হয়েছিল। আদালত সেই যুক্তিগুলো বিবেচনায় নেন। এছাড়া, মৃত্যুর আগে প্রত্যুষা ও রাহুলের শেষ কথোপকথনের বিষয়টিও আদালতের নজরে আসে। আদালত জানিয়েছেন, সেই কথোপকথনে এমন কিছু পাওয়া যায়নি যা প্ররোচনা হিসেবে গণ্য হতে পারে; বরং সেখানে রাহুলকে প্রত্যুষাকে এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে বোঝানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুরে জন্ম নেওয়া প্রত্যুষা ২০১০ সালে ‘বালিকা বধূ’ ধারাবাহিকে আনন্দীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর তিনি ‘বিগ বস ৭’, ‘ঝলক দিখলা জা’ ও ‘হাম হ্যায় না’-এর মতো জনপ্রিয় শোতে নিয়মিত ছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল সময়েই মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু পুরো বিনোদন অঙ্গনকে স্তব্ধ করে দেয়।
প্রত্যুষার মৃত্যুর পর থেকে তাঁর বাবা শংকর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন আমূল বদলে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মামলা লড়তে গিয়ে তাঁদের জমানো সঞ্চয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ধার-দেনা করে মামলার খরচ চালাতে হয়েছে তাঁদের। মেয়ের মৃত্যুর এতগুলো বছর পার হওয়ার পরও তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে পুরোপুরি ফিরতে পারেননি। সোমা বর্তমানে একটি চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে কাজ করেন এবং শংকর লেখালেখি ও অন্যান্য মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করছেন। দশকের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার এই রায়ে মামলাটির বড় একটি অংশের সমাপ্তি ঘটলেও, স্বজন হারানো পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী বেদনার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিবাহিত প্রকৌশলীর সঙ্গে সম্পর্ক, মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল নিধির জীবনে।