নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষ করে জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের সাবেক মিত্র বিএনপির সঙ্গে বিদ্যমান দূরত্ব এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে এসব গুঞ্জনকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট জানিয়েছে, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। এই বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দেশ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যারা ২৪-এর গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাদের বিচার দেশবাসী নিশ্চিত করবে। জামায়াত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নীতিগত রাজনৈতিক ধারা বজায় রেখে চলছে বলেও তিনি জানান। এরপরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কথিত ‘অ্যালায়েন্স’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়তে থাকে।
তাত্ত্বিক ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক টানাপড়েনের মূলে রয়েছে কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা। গত ১লা অক্টোবর ফেনীর ফুলগাজীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করার দায়ে স্বৈরাচার ও গুপ্তদলের যোগসাজশের অভিযোগ তোলেন এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এর আগে জামায়াতের আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। প্রদর্শনীর ছবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের উপস্থিতি থাকলেও জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি না থাকায় বিএনপি এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যার ব্যাখ্যা জামায়াত পরবর্তী সময়ে প্রদান করে। পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়।
জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় সাম্প্রতিক লংমার্চগুলোতে। সেপ্টেম্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও রংপুরের লংমার্চে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলোকে মূল দাবিতে পরিণত করে। তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ প্রসঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, গত ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াতের একটি অংশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। জোটের একাধিক সূত্র জানায়, গত আগস্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াত ও এনসিপি সারা দেশে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে।
নির্বাচনী ও সাংগঠনিক কৌশল নিয়ে জোটের পরবর্তী পরিকল্পনাও বেশ সক্রিয়। বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭৭টি আসন নিয়ে জামায়াত জোট বিরোধী দলে রয়েছে এবং সংরক্ষিত নারী আসনে তাদের ১২ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। জোট সূত্রে জানা যায়, আগামী ১৪ই নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠেয় মহাসমাবেশের দিনক্ষণ পরিবর্তন হতে পারে। দেশজুড়ে লংমার্চের ধারাবাহিকতায় বরিশাল, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগকে কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে। লংমার্চ শেষ করে ডিসেম্বরে মহাসমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে জোটের। শিগগিরই দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে জানানো হবে।
সংসদের ভেতরে সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি এবং বিভিন্ন সংসদীয় কমিটিতে সরব থাকার পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নির্ধারণ করেছে জামায়াত। ফ্যাসিবাদী বয়ান বা কর্মকাণ্ড যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, যারা জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সের প্রশ্নই আসে না। এই অবস্থানটি জামায়াতের প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্টভাবে বজায় রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এখন ক্ষমতায় থেকে যদি কেউ ফ্যাসিবাদের বয়ান আওড়ান, তাহলে সেটা তার জন্য, তার দলের জন্য এবং দেশবাসীর জন্য নিশ্চয়ই কোনো কল্যাণকর হবে না। আমরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সেই প্রস্তুতি রেখেছি।