দিনাজপুর শহরের উপশহর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোডে অবস্থিত জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট হৃদরোগের চিকিৎসায় দিনাজপুরসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে এখন আস্থার এক নির্ভরযোগ্য নাম। ১৯৯২ সালে সাবেক মন্ত্রী খুরশিদ জাহান হক অসংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলার লক্ষ্যে এই সেবাপ্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৯৩ সালে মুন্সিপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর নিজস্ব জমিতে এটি আজ বিশাল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে হৃদরোগের পাশাপাশি নিউরো মেডিসিন, সার্জারি, অর্থোপেডিক, ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, ইকো, ইটিটি ও সিটি স্ক্যানের সুবিধাও রয়েছে।
বাগেরহাটের চিতলমারীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য এই হাসপাতালের সেবার একটি উদাহরণ। গাজীপুরের পোশাক কারখানায় কর্মরত এই ব্যক্তি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ওপেন হার্ট সার্জারির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি এই হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সফল অস্ত্রোপচারের পর এখন সুস্থ আছেন। বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও হাসপাতালটি তাকে বিশেষ ছাড় প্রদান করেছে বলে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। বাগেরহাটের চিতলমারীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য (৪৫) এই হাসপাতাল থেকে হৃদরোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, দ্রুত অস্ত্রোপচার না করলে তাঁর হৃদযন্ত্রের জটিলতা বাড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি এখন অলাভজনক ও নিজস্ব আয়ে পরিচালিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। বর্তমানে এখানে ৩৫০টি শয্যা এবং ৩০২ জন কর্মী রয়েছেন, যার মধ্যে ১৫২ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স। প্রতি বছর গড়ে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নেন এবং নিয়মিত অর্ধশতাধিক জরুরি রোগী সেবা পান। গড়ে দৈনিক ১৫টির বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এই হাসপাতালে। এমনকি দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকেও রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। হাসপাতালে নিয়মিত ভর্তি থাকেন শতাধিক রোগী, যাঁদের মধ্যে গড়ে ৩০ জন হৃদরোগী। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিক্যাল অফিসার ও নার্স রয়েছেন ১৫২ জন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ১৫০ জন। ২১ সদস্যবিশিষ্ট একটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।
হাসপাতালের শুরু থেকেই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এক্স-রে টেকনিশিয়ান মোকাররম হোসেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, শুরুর দিকে সাধারণ মানুষের অনুদান ও কায়িক শ্রমে ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। মানুষ ইট, সিমেন্ট কিংবা শ্রম দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে এর অধীনে কেয়ার স্পেশালাইজড জেনারেল হাসপাতাল ও কেয়ার নার্সিং কলেজও পরিচালিত হচ্ছে।
দরিদ্র রোগীদের জন্য হাসপাতালটির একটি বিশেষ জাকাত ফান্ড রয়েছে। এই তহবিলের অর্থায়নে অসচ্ছলরা ৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সহায়তা পান। ২০১০ সালে চালু হওয়া এই তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার রোগী সুবিধা পেয়েছেন। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করে ৩২৭ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জয়পুরহাটের বর্গাচাষি এমদাদুল হক হৃদযন্ত্রে রিং পরানোর সময় এই তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন। চিকিৎসার মান ও তুলনামূলক কম ব্যয়—এই দুই কারণে রোগীরা হাসপাতালটির ওপর আস্থা রাখছেন বলে কর্তৃপক্ষ ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
চিকিৎসা শিক্ষার বিস্তারে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ। এখান থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করেছেন। সচিব শাহজাহান আলীর তথ্যমতে, এখানকার অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বিদেশেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রদীপ কুমার রায় জানান, তার নার্সিং পড়ার সিদ্ধান্তটি ছিল জীবন বদলানোর মতো সঠিক এক পদক্ষেপ। বর্তমানে এখানে এমএসসি ইন নার্সিংয়ের মতো উন্নত কোর্স চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আজাদ জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। ২০০৬ সালের পর থেকে স্থানীয় মানুষের অনুদানেই এর কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল চত্বরে বর্তমানে মোজাম্মেল হক ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস এবং খুরশিদ জাহান হক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতালের কার্যক্রমও চলমান। ভবিষ্যতে চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়নে ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ ও কেয়ার মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার পরিধি বাড়াতে কর্তৃপক্ষ নিয়মিত নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।