লাখো নারীর কর্মসংস্থানের পথে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্তানদের নির্ভরযোগ্য স্থানে রাখার ব্যবস্থা। কর্মজীবী মায়ের সন্তানের সঠিক যত্ন ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় অনেকেরই পেশাজীবনে ছন্দপতন ঘটছে। ৩২ বছর বয়সি নুসরাত জাহানের বাস্তব অভিজ্ঞতাই এর বড় উদাহরণ। শিক্ষকতায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও গাবতলীতে বসবাসকারী নুসরাতের পক্ষে মিরপুর ১০ নম্বরের সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারের দূরত্ব ছিল প্রায় সাত কিলোমিটার। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর খরচ ছিল তার নাগালের বাইরে, ফলে পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে তিনি শেষ পর্যন্ত চাকরি ছাড়তেই বাধ্য হন। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ২ কোটি ৩৬ লাখ কর্মজীবী নারী রয়েছেন। অথচ তাদের সন্তানদের সেবার জন্য সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে মাত্র ৬৪টি, যার মোট সক্ষমতা ৪ হাজারের কিছু বেশি শিশুর। সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন। তার প্রথম সন্তানের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু, স্কুলে ক্লাস নেওয়ার সময়টুকুতে সন্তানকে কোথায় এবং কার কাছে রেখে যাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। বাসা থেকে সবচেয়ে কাছের সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারটি মিরপুর ১০ নম্বরে—প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে। বাসার কাছাকাছি যেসব বেসরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারের খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন, সেগুলোর খরচ তার সামর্থ্যের বাইরে। সুবিধাজনক জায়গায় নির্ভরযোগ্য শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র না পেয়ে তাদের অনেককেই চাকরি ছেড়ে দিতে হয়, কিংবা সাময়িকভাবে কর্মজীবন থেকে দূরে থাকতে হয়।
সরকারি ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অনেক কেন্দ্রে আসন পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। তাছাড়া কিছু কেন্দ্র সরকারি অফিসের ভেতরে হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য সেখানে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। সচিবালয়ের ভেতরে থাকা ৫০ আসনের ডে-কেয়ার সেন্টারে যেখানে ৭০ থেকে ৮০টি আবেদন জমা পড়ে, সেখানে সবার সুযোগ পাওয়া যে কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া কেন্দ্রগুলোর প্রচারণার অভাব থাকায় অনেক অভিভাবক জানেনই না যে তাদের এলাকায় সরকারি ডে-কেয়ার সুবিধা রয়েছে। অন্য ডে-কেয়ারগুলো নিয়েও প্রচার-প্রচারণা কম। এ ছাড়া, সচিবালয়ের কর্মচারীদের সন্তানদেরই এখানে জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণের ফলে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, সন্তানের দেখাশোনা কে করবে—এই প্রশ্নটিই নারীর কর্মজীবনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। নারী অধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি কেবল নারীর ক্ষমতায়ন নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সমস্যা। ডে-কেয়ার সেবার মানসম্মত হওয়া এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যথায় সব নারীর পক্ষে এর সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না।
সরকারি ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন স্বীকার করেন যে, বর্তমান অবস্থায় কারো সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জানান, বিদ্যমান চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। সংকট মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নতুন জায়গা বরাদ্দ পাওয়ার চেষ্টা করছে। মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভবনে জায়গা দিলে মন্ত্রণালয় আসবাবপত্র ও কর্মী দিয়ে সহায়তা করবে। এছাড়া ঢাকা, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে নতুন ১৫০টি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
বর্তমানে ৬৪টি ডে-কেয়ার সেন্টারের মধ্যে ৪৪টি নিজস্ব আয়ে এবং ২০টি প্রকল্পের অর্থায়নে চলছে। নিজস্ব আয়ের কেন্দ্রগুলোতে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য মাসিক ফি ১০০ টাকা এবং মধ্যম আয়ের জন্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রকল্পের অধীনে থাকা কেন্দ্রগুলোতে শিশুর বয়স ও অভিভাবকদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে মাসিক ফি ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর বাইরেও ভর্তি ফি বাবদ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। এই কেন্দ্রগুলোতে মূলত পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকারি সুবিধা না পেয়ে অনেক পরিবার বেসরকারি কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন, যার খরচ সরকারি কেন্দ্রের চেয়ে পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি। যেমন, পল্লবীর একটি সেন্টারে সারাদিনের জন্য ৬ হাজার টাকা এবং গুলশানের একটি সেন্টারে ৯ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়। আগারগাঁওয়ের রাহেনা বেগম জানান, অনেক সরকারি ডে-কেয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও প্রচারণার অভাবে সাধারণ মানুষ তা জানেন না। সরকারি ডে-কেয়ারের মহাপরিচালক শায়লা শারমিন জানান, বর্তমানে নতুন ৬০টি কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে এবং ভুল ধারণা দূর করে সরকারি কেন্দ্রগুলো সবার জন্য ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।