মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দক্ষিণ রাঢ়ীখালের বাসিন্দা মো. নূর-উল-হোসেন, যিনি এলাকায় ‘হোসেন স্যার’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। শান্তিনিকেতন থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এই শিক্ষক ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তাঁর জীবনের শেষ দিকের ছাত্র ছিলেন বর্তমান স্মৃতিচারণকারী মুজিব রহমান। হোসেন স্যার কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদের মতো গুণী মানুষেরও শিক্ষক। হুমায়ুন আজাদের পৈতৃক বাড়ির পূর্ব দিকের পুকুরপাড়েই ছিল হোসেন স্যারের বাড়ি।
শিক্ষক হিসেবে হোসেন স্যার ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। শ্রেণিকক্ষে বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণ তিনি পছন্দ করতেন না। একবার সপ্তম শ্রেণির ক্লাসে তিনি ইংরেজি বর্ণ ‘৭’ লেখার সঠিক পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন, যাতে তা পেট কাটা না দেখায়। মানবিক বিভাগের বিষয়গুলো—ভূগোল, পৌরনীতি ও ইতিহাস পড়াতে তিনি পারদর্শী ছিলেন। তিনি সাধারণত প্রাইভেট পড়াতেন না, তবে একবার দুই মাসের জন্য স্মৃতিচারণকারীকে পড়িয়েছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে তিনি রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোল্গা থেকে গঙ্গা’র মতো বই পড়তে উৎসাহিত করতেন।
স্যার প্রায়ই একটি কথা বলতেন, ‘পদ্মাপারের মানুষেরাই একদিন রাজধানী ঢাকা দখল করবে!’ যদিও সেই সময়ে তাঁর এই কথার গভীর অর্থ ছাত্ররা পুরোপুরি বুঝতে পারত না। শুক্রবার সকালে কেনাকাটার জন্য তিনি ভাগ্যকুল বাজারে আসতেন। সেই সুবাদে ছাত্রের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ও দীর্ঘ পথ হাঁটার সুযোগ হতো, যেখানে নানা বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলত।
অবসরের পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা না দেওয়ায় প্রাক্তন ছাত্ররা নিজেরাই উদ্যোগী হন। ১৯৯৩ সালের এক শুক্রবার আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। তিনি জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর গ্রামে না এলেও হোসেন স্যারের জন্য তিনি এসেছেন। সেই অনুষ্ঠানে দুই কৃতী মানুষের আলিঙ্গন ও হুমায়ুন আজাদের আবেগঘন বক্তব্য উপস্থিত সবাইকে আপ্লুত করেছিল। হুমায়ুন আজাদ হাইস্কুলটিকে হোসেন স্যারের কারণেই ‘তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে অভিহিত করতেন।
হোসেন স্যার লেখালেখিতেও বেশ আগ্রহী ছিলেন। তিনি অন্তত ২০টি বই লিখেছিলেন, যার মধ্যে উপন্যাস, কবিতা, ইতিহাস ও প্রবন্ধের বই রয়েছে। বইগুলো তিনি নিজের অর্থেই প্রকাশ করতেন এবং বিভিন্ন স্কুল বা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিক্রি করতেন। তাঁর বইগুলোর কোনোটির মূল্যই ১০০ টাকার বেশি ছিল না। তাঁর লেখায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, প্রেম, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সমাজ বিনির্মাণের বার্তা ফুটে উঠত।
হোসেন স্যার গত হয়েছেন অন্তত ২০ বছর আগে। তাঁর প্রিয় ছাত্র হুমায়ুন আজাদও আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে স্মৃতিচারণকারী মুজিব রহমান আজও কর্মস্থলে যাওয়ার পথে স্যারের সেই অমূল্য শিক্ষা ও সান্নিধ্যের কথা স্মরণ করেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের জীবন ও আদর্শ আজও তাঁর প্রাক্তন ছাত্রদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রিয় পাঠক, নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@.com। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একবার ক্লাস সেভেনে একজন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে স্যার ক্লাস নিতে এলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্লাসে এসেই স্যার নাম ডাকতে শুরু করলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরাও যথারীতি ‘জি স্যার’ বলে উপস্থিতি জানান দেওয়া শুরু করলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বললেন, বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা দূষণীয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইংরেজিতে এমনভাবে ‘৭’ লিখতে শেখালেন, যাতে পেট কাটা না লাগে।