যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের সেন্ট্রাল পার্কে দেড় শ বছরের বেশি সময় ধরে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ি। তবে দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য এবার চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। নিউইয়র্ক শহরের আইনপ্রণেতারা এই বিনোদনব্যবস্থা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে সিটি কাউন্সিলে এই বিলের ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। বিলটি পাস হলে ২০২৮ সালের মধ্যে সেন্ট্রাল পার্ক থেকে ঘোড়ার গাড়ি সম্পূর্ণভাবে উঠে যাবে। গাড়িতে চড়ার অভিজ্ঞতা নিতে সেন্ট্রাল পার্কে যান অসংখ্য দর্শনার্থী। আধুনিক ও জনবহুল একটি নগরে অতীতের স্মৃতি বহনকারী এই বিনোদনব্যবস্থা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন ওঠে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা শুধু ছেলেকে হারানোর কথাই ভাবি।’।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে গত বসন্তে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ভারত থেকে আসা ১৮ বছর বয়সী পর্যটক রোমাঞ্চ মহাজন পরিবারের সঙ্গে পার্কে ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে গিয়ে প্রাণ হারান। ঘোড়াটি হঠাৎ দ্রুত ছুটতে শুরু করলে গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে তিনি নিহত হন। এই ঘটনার পর ঘোড়ার গাড়ি চালনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদ শুরু হয়। পরিবারের সদস্যরা সিটি হলে গিয়ে সরাসরি এই প্রথা বন্ধের দাবি জানান। শুনানিতে ভিডিও কলের মাধ্যমে রোমাঞ্চের বাবা দীপক মহাজন জানান, ঘোড়াটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে তার স্ত্রী সিট থেকে ছিটকে পড়েন এবং মাকে বাঁচাতে গিয়েই তার ছেলে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই ঘটনা তাদের পুরো পরিবারকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। ঘোড়ার গাড়ি বন্ধের সর্বশেষ উদ্যোগটি নেওয়া হয় গত জুনে। পরিবারের কেউ কেউ ভিডিও কনফারেন্সেও যুক্ত হন।
প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ব্যস্ত শহরের জনবহুল এলাকায় পর্যটক বহনের জন্য ঘোড়া ব্যবহার করা মোটেও নিরাপদ নয়। গাড়ির শব্দ এবং মানুষের ভিড়ে ঘোড়াগুলো প্রায়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এর আগেও ঘোড়ার গাড়ি বন্ধের জন্য কয়েকজন মেয়র আহ্বান জানিয়েছিলেন। বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানি ও সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিনও বিলটির পক্ষে একমত হয়েছেন। স্পিকার জুলি মেনিন বলেন, রোমাঞ্চ মহাজনের মৃত্যু প্রমাণ করে যে বর্তমান ব্যবস্থাটি জননিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি আর গ্রহণযোগ্য নয়। প্রাণী অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছেন। মেয়র জোহরান মামদানির কার্যালয় জানিয়েছে, বিলটি নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। অতীতেও কয়েকবার ঘোড়া রাস্তায় পড়ে গেছে, ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করেছে কিংবা গাড়ি ও অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। তবে ঘোড়ার গাড়ির চালক ও ঐতিহ্যটির সমর্থকেরা ভিন্নমত পোষণ করেন।
সিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বিলটি পাস করার জন্য পর্যাপ্ত সমর্থন রয়েছে। মেয়র মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা করেছেন যে নিউইয়র্কে ঘোড়ার গাড়ির শিল্পের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। যদিও ঘোড়ার গাড়ি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এবং সমর্থকরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, এটি নিউইয়র্কের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ, যা পর্যটকদের পুরোনো দিনের শহরের স্বাদ দেয়। তারা মনে করেন, এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে নগরের ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ চিরতরে হারিয়ে যাবে। তবুও প্রতিটি দুর্ঘটনার পর জননিরাপত্তার খাতিরে এই ঐতিহ্য বন্ধের দাবি প্রতিনিয়ত আরও জোরালো হচ্ছে। ধ্রুপদি সিনেমা ও টেলিভিশনের নানা দৃশ্যেও এই গাড়িগুলো জায়গা করে নিয়েছে।