একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট কবি, গবেষক, সম্পাদক এবং দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী আর নেই। শুক্রবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। কাল শনিবার বায়তুল মোকাররম মসজিদে বাদ যোহর নামাজে জানাজা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদের সেক্রেটারী ড. মনোয়ারুল ইসলাম। কবি আল মুজাহিদী এ সাংস্কৃতিক সংসদের উপদেষ্টা ছিলেন। এর আগে বেলা ১২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি কবির ছেলে শাবিব আল মুজাহিদীর উদ্বৃতি দিয়ে জানান, গত বুধবার অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় একাধিকবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। রক্তে সংক্রমণ, কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় তিনি ভুগছিলেন। সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে আবারও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে চিকিৎসকরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি।
কবির মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী জানান, তাঁর বাবা প্রায় দুই বছর থেকে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তাঁর হার্টে দুবার রিং পরানো হয়েছিল। গত বছর জুলাই মাসে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন। এরপর তাঁর কিডনিতেও সমস্যা দেখা দেয়। গত ২৩ এপ্রিল তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ২৬ মে হাসপাতাল থেকে উত্তরার ১০ সেক্টরের নিজ বাসভবনে আনা হয়। পরে আবার অসুস্থ হলে ৪ জুন তাঁকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় চিকিৎসক জানিয়েছিলেন তাঁর কিডনি, হৃদ্যন্ত্রসহ একাধিক অঙ্গের কার্যকারিতা কমে গেছে। এ অবস্থার আরও অবনতি হলে গত ১৫ জুন তাঁকে পুনরায় ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরদিন থেকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। আজ তিনি গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হন (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট)। বেলা ১টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল মুজাহিদী। তাঁর বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন নাট্যকার ও সংগঠক এবং মা সাখিনা খান ছিলেন গীতিকার ও সমাজকর্মী। আল মুজাহিদী ছিলেন একধারে কবি, গবেষক ও সম্পাদক ছিলেন। গত শতকের ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত ছিলেন তিনি ।
টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পৃথকভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত আল মুজাহিদী আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। মৃত্তিকা, প্রকৃতি, প্রেম, জাতীয় চেতনা এবং আত্মদর্শন তাঁর কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ এবং অনুবাদ সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা’, ‘সমুদ্র মেখলা’, ‘কালের বন্দিশে’, ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’, ‘প্রাচ্য পৃথিবী’ এবং ‘সন্ধ্যার বৃষ্টি’।
উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তিনি সমান স্বাক্ষর রেখেছেন। পাশাপাশি কাইফি আজমি, আহমদ ফরাজ, হাইনরিশ হাইনে প্রমুখ কবির রচনার অনুবাদও করেছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে। এ ছাড়া তিনি জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার এবং জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী পলিন পারভীন, ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী, মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
এদিকে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।