নির্বাচনী অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার দেশের কর্মকাণ্ডের সাফাই গেয়ে ভাষণ দেন। তবে তিনি মঞ্চে উঠতেই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ স্বরূপ অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। এই ঘটনা গাজায় চলমান যুদ্ধ ঘিরে নেতানিয়াহুর ওপর আন্তর্জাতিক মহলের ক্ষোভ ও চাপের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ইসরায়েলি নির্বাচনে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় এই ভাষণটি কার্যত তার নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাহফুজ আনামের কলাম / গণমাধ্যমকে সীমাবদ্ধ করবে খসড়া সাইবার আইন।
বক্তব্য প্রদানের সময় নেতানিয়াহু পশ্চিমা নেতাদের ‘ইহুদিবিদ্বেষী জনতার’ কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ তোলেন। বিশেষ করে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে লক্ষ্য করে তিনি তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন, তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সত্যকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য যে, মামদানি অতীতে নির্বাচনী প্রচারণার সময় নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি স্বীকার করেন যে, তার সেই আইনগত এখতিয়ার নেই। তবুও চলতি সপ্তাহে মামদানি তাকে ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার কারিগর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু জেনে রাখুন, আপনারা আমাকে থামাতে পারবেন না; সত্যকে কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যায় না।’। নেতানিয়াহু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা আমার দেশ এবং আমাদের সাহসী সেনাদের নিয়ে এসব মিথ্যা ছড়াচ্ছে, তারা এই সভাকক্ষেই থাকুক কিংবা নিউইয়র্কের সেই ইহুদিবিদ্বেষী মেয়রের কার্যালয়ে—আমি তাদের সবাইকে বলছি: ধিক্কার তোমাদের!’।
নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল গণহত্যা চালায়নি, বরং গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে। তিনি মামদানির বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তুললে মেয়র তা সরাসরি অস্বীকার করেন। নেতানিয়াহুর বক্তব্যের জবাবে মামদানি পরে এক বিবৃতিতে জানান, যুদ্ধাপরাধের দায় ঢাকতে নেতানিয়াহু ভিত্তিহীন মিথ্যাচারের পুনরাবৃত্তি করছেন, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সত্যতাকে আড়াল করতে পারবে না। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।’।
একই ভাষণে নেতানিয়াহু তুরস্ক ও কাতারের বিরুদ্ধেও মিথ্যা অপপ্রচারের অভিযোগ তোলেন। তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে স্বৈরাচারী আখ্যা দিয়ে আঙ্কারার বিরুদ্ধে হামাস নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনেন। জবাবে তুরস্ক ও কাতার উভয়ই নেতানিয়াহুর এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব আক্রমণের উদ্দেশ্য হলো গাজায় ইসরায়েলি সরকারের ব্যর্থতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানো। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, দোহার বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর এই ক্রমাগত আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো, গাজায় তার সরকারের ব্যর্থ নীতির দায়ভার থেকে মানুষের নজর ঘোরানো। শুক্রবার তুরস্কের সরকারি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এ তথ্য জানায়।
ভাষণটি ইসরায়েলের চারটি প্রধান টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রায় ৪০ মিনিটের এই বক্তৃতায় তিনি ইরানের বিরুদ্ধেও কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে দাবি করেন, অচিরেই ইরান সরকার জনগণের দ্বারা উৎখাত হবে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো বৈঠক হয়নি, তবুও নেতানিয়াহু ট্রাম্পের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং যুদ্ধে ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো সঙ্গী নেই বলে মন্তব্য করেন। নির্বাচনের যখন পাঁচ সপ্তাহেরও কম সময় বাকি, তখন নেতানিয়াহু জাতিসংঘে প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণ দিলেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’ জানিয়েছে, জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি দেশে ফেরার পথ ধরেন। এর আগে তিনি প্যারাগুয়ে, পানামা ও বলিভিয়ার নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের অধীনে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর আগমন ঘিরে নিউইয়র্কে ব্যাপক নিরাপত্তার পাশাপাশি ইসরায়েলের সমর্থনে ৫০০টি বিলবোর্ড স্থাপন ও প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সব মিলিয়ে তার এই সফর একদিকে যেমন কূটনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে দেশে-বিদেশে তার ওপর থাকা বহুমুখী চাপকে নতুন করে সামনে এনেছে। এ সময় গ্যালারিতে থাকা তার সমর্থকেরা হিব্রু ভাষায় স্লোগান দিতে থাকেন— ‘ইসরায়েলের জনগণ বেঁচে আছে’।