সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও হাতে নিয়োগপত্র না আসায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার পর নিয়োগপত্র থেকে বাদ পড়ায় হাজারও প্রার্থী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। প্রার্থীদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার, যদিও অন্য একটি হিসাবে এই সংখ্যা ২ হাজার ২০০-এর বেশি বলে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের পর বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় না থাকায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও জটিলতা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি যেকোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগপত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নিয়োগপত্র পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, সাধারণত চারটি প্রধান কারণে প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনই মুখ্য। এছাড়া ডোপ টেস্টে সমস্যা, স্বাস্থ্য সনদ না থাকা এবং শিক্ষা সনদের তথ্যে গরমিল থাকার কারণেও অনেককে বাদ পড়তে হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর কেন অনেকের নাম নিয়োগের তালিকায় নেই, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
বাদ পড়া প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মটি ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। তারা দাবি জানিয়েছে, বাদ পড়া প্রত্যেকের নথি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ উপায়ে পুনরায় যাচাই করতে হবে। সেই সঙ্গে তথ্যগত ভুলের শিকার প্রার্থীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। কোনো দপ্তর বা কর্মকর্তার ত্রুটি বা ভুল তথ্যের কারণে কেউ বাদ পড়ে থাকলে, তা সংশোধন করে দ্রুত নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিও তোলা হয়েছে। এছাড়া পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন তারা। যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য কারণ নেই, তাদের ক্ষেত্রে পুনর্যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চান।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরুর পর থেকেই এই অভিযোগগুলো সামনে আসে। বিশেষ করে চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, সাতক্ষীরা, ঝালকাঠি, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জ জেলায় বড় সংখ্যক প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শুধু এসব জেলাতেই ৩৫১ জন নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে বাদ পড়ার ঘটনা দেশজুড়েই বিস্তৃত। এসব জেলার তথ্য যোগ করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫১।
নিয়োগ বঞ্চিত প্রার্থীরা খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। খুলনায় সুপারিশ পাওয়া ২৭৫ জনের মধ্যে কাগজপত্র জমা দেওয়া ২৬৫ জনের মধ্যে ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেলেও ৬৯ জন বঞ্চিত হয়েছেন। একইভাবে সুনামগঞ্জে ১২০ জন, মৌলভীবাজারে ৬৭ জন এবং নাটোরে প্রতিবন্ধী প্রার্থীসহ মোট ৩৪ জন চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগ পাননি। যশোরে ২৯০ জনের মধ্যে ১০৬ জন নিয়োগপত্র না পাওয়ার তথ্য মিলেছে। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, সাতক্ষীরায় ২, ঝালকাঠিতে ১২, লক্ষ্মীপুরে ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, পাবনায় ৩৫, রাজবাড়ীতে ১৫, ফরিদপুরে ১২, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, সাতক্ষীরায় ২, ঝালকাঠিতে ১২, লক্ষ্মীপুরে ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, পাবনায় ৩৫, রাজবাড়ীতে ১৫, ফরিদপুরে ১২, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০, কুষ্টিয়ায় ১৬ এবং মানিকগঞ্জে ২২ জন। সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন উত্তীর্ণ হন। পরে মৌখিক পরীক্ষা শেষে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। আগামী ১ অক্টোবরকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের যোগদান ও পদায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর জেলা শিক্ষা অফিসে যোগদানের পর ৪ অক্টোবর পদায়নের আদেশ জারি করার কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বক্তব্য, ১ অক্টোবর পর্যন্ত যারা নিয়োগপত্র পাবেন না, তাদের বিষয়টি পুনরায় খুঁটিনাটি যাচাই করে দেখা হবে। তবে বঞ্চিত প্রার্থীরা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া এভাবে বাদ দেওয়া অন্যায় এবং তারা অযোগ্য কাউকেই নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন না, বরং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনর্যাচাই চাইছেন।