দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সব সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন যে, দেশটিতে বর্তমানে জোটের আর কোনো সদস্য অবশিষ্ট নেই। নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই সর্বশেষ মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নারীদের পাচার করে নির্যাতন, ভিডিওবার্তায় জানানোর পর চক্রের হোতা গ্রেপ্তার।
মার্কিন এই সেনা প্রত্যাহারকে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে উদযাপন করছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি জানিয়েছেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি ও উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দামও এই প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বিদেশি সেনা চলে যাওয়ায় ইরাকে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রমাণিত সিটির আর্থিক কেলেঙ্কারি, আনুষ্ঠানিকভাবে দোষী সিটি।
তবে এই সিদ্ধান্তে ইরাকের সর্বত্র স্বস্তি নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষক জসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন জোটের বিদায় ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তার ওপর তেহরানের প্রভাব ভারসাম্যহীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফালুজ্জার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাইয়ের মতে, ইরাক এখনো এককভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তায় তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি আর থাকছে না। দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও আইএস এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এবং কুর্দি অঞ্চলের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তা, ড্রোন নজরদারি ও লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) পুনরায় সক্রিয় হতে পারে। কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি দাবি করেছেন, গত দুই সপ্তাহে আইএসের সুপ্ত সেলগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী এমন একটি সেলের হদিস পেয়েছে, যারা জোটের বিদায়ের সময় হামলার পরিকল্পনা করছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে পাওয়া মতামত-প্রস্তাব সংসদে আলোচনা হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে শুরু হওয়া মার্কিন অভিযানের পর ২০১১ সালে একবার সেনা প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের কারণে তারা পুনরায় ফিরে আসে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এই দুই দশকের দীর্ঘ যুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং চলতি বছরেও সাতজন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ২৫ বছরের মার্কিন যুদ্ধে মোট ৪৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রথম ডোজে কলেরার টিকা পেয়েছেন ৮২.৬ শতাংশ, বাদ পড়েছেন সাড়ে ৮ লাখ। পরবর্তী সময়ে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি বজায় থাকে এবং তারা দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ দমনে লড়াই করে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্ব খুব দ্রুত শেষ হতে পারে। তিনি দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর আগে সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইনে হামলার ঘটনায়ও ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল, যা নিয়ে বাগদাদ তদন্ত করছে।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। যেখানে একদিকে ইরানের পার্লামেন্ট সদস্যরা মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই অঞ্চল ছাড়তে হবে, অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা স্থানীয় শূন্যতায় আইএসের মতো গোষ্ঠীর উত্থানের ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন।