২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন বেলজিয়ামের পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজ্যান। দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফের স্তরে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ স্থাপন করে মহাজাগতিক উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদানের জন্য তাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে এই ঘোষণা দেয়। বরফের মধ্যে স্থাপন করা বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে সেই আলো শনাক্ত করা সম্ভব। পরে অন্যান্য গবেষকের সমর্থনে বরফের গভীরে সেন্সর স্থাপনের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়।
১৯৮৮ সালে ফ্রান্সিস হালজ্যান প্রথম দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ বরফকে নিউট্রিনো শনাক্তের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ধারণা দেন। তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বিশাল অবকাঠামোটি প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে বিস্তৃত, যেখানে অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর বসানো হয়েছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১১ সালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্সের চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ফ্রান্সিস হালজ্যান আন্তর্জাতিক গবেষক ও প্রকৌশলীদের একটি দক্ষ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন পথ উন্মোচন করেছে। তার অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন একটি পথ উন্মুক্ত করেছে।
নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও প্রায় ভরহীন কণা, যা মহাবিশ্ব থেকে প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে আসছে। এগুলো কোনো বাধা ছাড়াই পৃথিবী ও মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যায়। তবে বিরল ক্ষেত্রে নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে আলোর ঝলক তৈরি হয়, যা আইসকিউবের সেন্সরে ধরা পড়ে। মহাবিশ্বে এমন অনেক প্রাকৃতিক কণা ত্বরক রয়েছে, যেগুলো গবেষণাগারে তৈরি সর্বোচ্চ শক্তির চেয়েও প্রায় ১০ লাখ গুণ বেশি শক্তিশালী কণা উৎপাদন করতে পারে। উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো মহাজাগতিক পথে দিক পরিবর্তন করে না বলে এগুলো থেকে মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও শক্তিশালী ঘটনা সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য পাওয়া সম্ভব। এসব শক্তিশালী মহাজাগতিক উৎসের প্রকৃতি ও সেখানে সংঘটিত প্রক্রিয়া এখনও অনেকটাই রহস্যময়। এ কারণে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দূরবর্তী ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানার নতুন পথ খুলে দিয়েছে নিউট্রিনো। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের অজানা নতুন ধরনের ঘটনাও আবিষ্কৃত হতে পারে।
আইসকিউব চালুর পর গবেষকেরা পৃথিবী ও সৌরজগতের অনেক দূর থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, যা নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। বর্তমানে আইসকিউব থেকে সংগৃহীত তথ্য মহাজাগতিক পরিবেশের রহস্য বুঝতে এবং নতুন কোনো মহাজাগতিক ঘটনা শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করছে। পরবর্তী সময়ে এমন নিউট্রিনোও শনাক্ত করা হয়, যেগুলোর উৎস পৃথিবী ও সৌরজগতের অনেক দূরে।
উল্লেখ্য, এর আগের দিন সোমবার (৫ অক্টোবর) চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নিউরোলজিস্ট কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল।
এ বছর নোবেল মৌসুমের ধারাবাহিকতায় বুধবার রসায়ন, বৃহস্পতিবার সাহিত্য এবং শুক্রবার শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। এরপর ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের নোবেল কার্যক্রম। ১৯০১ সালে আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়, যার সাথে পরবর্তীতে অর্থনীতি যুক্ত হয়েছে।