সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কে টানাপোড়েন ছাপিয়ে আবারও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ইঙ্গিত মিলছে। গত মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী মনসুর বিন জায়েদ সৌদি আরবে সফর করেন এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলে ছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির মহাসচিব আলী আল শামসি এবং ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আলী আল নেয়াদিসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক কিছু তৎপরতায় তেমন ইঙ্গিতই মিলছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ এই সফরকে রিয়াদ ও আবুধাবির গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশ দুটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়টি এই সফর বিনিময় থেকে স্পষ্ট। তবে একসময় ইয়েমেন সংকটসহ বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। দৃশ্যত মনে হচ্ছিল তারা যেন চিরকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান সময়ের সাথে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকলেও আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি)’ সমর্থন দেওয়া শুরু করে। আমিরাত হোদেইদাহ বন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার পর যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিলেও রিয়াদ পুরো ইয়েমেন থেকে হুথিদের হঠাতে বদ্ধপরিকর ছিল। যৌথ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের অবস্থান সমন্বয়ের লক্ষ্যে উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায়ই যাতায়াত করে থাকেন।’। বিশেষ করে সৌদির ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ছিল তেহরানের লক্ষ্যবস্তু।
সুদান ও ইরান ইস্যুতেও দেশ দুটির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য ছিল। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো সাহসী সিদ্ধান্তও নিতে পেরেছিল। এছাড়া, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের আওতায় আমিরাত এগিয়ে থাকলেও সৌদি আরব দীর্ঘ সময় বিরত ছিল। তবে বর্তমানে হুথিদের হুমকির মুখে রিয়াদ তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে নিরাপত্তা সম্পর্ক বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছে। যদিও সৌদি আরব এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। তবে বর্তমানে হুথির হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে ইসরাইলের পরিবর্তে পাকিস্তান ও পুরোনো শত্রু তুরস্কের দিকে ঝুঁকেছে রিয়াদ।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের পরের দিনই মনসুর বিন জায়েদ সৌদি সফর করেন। ইসরাইলি গণমাধ্যমের দাবি, এই বৈঠকে সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং ইরান ও হুথিদের মতো অভিন্ন হুমকি মোকাবিলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া ও হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলা সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও তেল অবকাঠামোর জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এক দশক আগে ইয়েমেনে জড়িয়ে পড়া সৌদি আরব ২০২২ সালে অনেকটা কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে সরে এসেছিল। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফের হুমকির মুখে পড়ায় রিয়াদ মরিয়া হয়ে ওঠে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার রোধে একটি বহুজাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেন। এর বাইরে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করা হয়েছিল, যা প্রতিরোধের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছেও নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহায়তার জন্য দ্বারস্থ হয় সৌদি। তবে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনাগ্রহ প্রকাশ করলে, চীনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজে লাগিয়ে ইরান ও তাদের প্রক্সিদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালানো হয়।
গত বুধবার সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলে যুবরাজ সালমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর হামলা মূলত পুরো অঞ্চলের অখণ্ডতার ওপর আঘাত। ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে মিলে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে রিয়াদ কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অতীতে মুসলিম ব্রাদারহুড নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সিরিয়া, কাতার ও তুরস্ক ইস্যুতে দেশ দুটির নীতিতে এক ধরনের সমন্বয় লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি মোহাম্মদ বিন সালমান ও মোহাম্মদ বিন জায়েদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও এই মৈত্রী গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়।
সম্পর্ক উন্নয়নের এই ধারা জুলাই মাস থেকেই দৃশ্যমান। জুলাই মাসে ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ দুই দেশের অটুট বন্ধনের কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ সৌদি বাদশাহ সালমানের কাছে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র পাঠান।
বর্তমানে ইয়েমেনে নতুন কোনো সামরিক হস্তক্ষেপে না গিয়ে সৌদি আরব ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের মিত্রদের দুর্বল করতে চায়। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে জিসিসি গঠিত হলেও, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত লড়াইয়ের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ কৌশল এখনো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ইরান শুধু সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই নয় বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি চাপিয়ে দিয়েছে।