মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা অসংগতি ও বিভ্রান্তি। রোববার রাতে মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর পদত্যাগের নির্দেশ সংক্রান্ত খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি সেটিকে স্রেফ ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর দপ্তর থেকে ওই সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। তবে পরদিন সোমবার সকালেই সেই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে ইশরাক নিজের ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতি’ দেওয়ার ঘোষণা দেন। অনলাইনে এ খবর প্রকাশের পর ইশরাকের দপ্তর থেকে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমাদের অফিশিয়াল প্রক্রিয়া অনুযায়ী আজকে সকালেই এটার অফিশিয়াল সিদ্ধান্তটা এসেছে। পরে প্রতিবাদলিপিটি ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। পদত্যাগের নির্দেশের খবর প্রচার করায় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সমালোচনাও করেন ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা। এ সময় অনুসারীরা স্লোগান দিয়ে তাঁর পদত্যাগের বিরোধিতা করেন।
রোববার রাত ১০টার দিকে মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এমন খবর সামনে আসার পরপরই তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
রাত ১০টা ২২ মিনিটে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে তিনি সবাইকে গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেন। চার মিনিট পর রাত ১০টা ২৬ মিনিটে একই গ্রুপে একটি অডিও বার্তা দেন তিনি।
এর চার মিনিট পর অডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত দল থেকে নেওয়া হলে তা উড়োখবরের মাধ্যমে আসবে না। এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত যদি দল থেকে আমরা নেই, তাহলে সেটি অবশ্যই উড়োখবরের মাধ্যমে আসবে না।’।
এছাড়া রাত ১০টা ২৮ মিনিটে তাঁর প্রেস কর্মকর্তা একটি প্রতিবাদলিপি পাঠান, যেখানে খবরটিকে অসত্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করা হয়। এতে খবরকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করা হয়।
রাত ১০টা ৪০ মিনিটে দেওয়া সর্বশেষ অডিও বার্তায় ইশরাক জোর দিয়ে বলেন, তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় সোমবার সকালে।
সোমবার সকাল সাড়ে আটটার পর ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানান, বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে। এরপর সকাল ৯টা ৮ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অডিও বার্তায় তিনি স্বীকার করেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেটিই তিনি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। আগের রাতে কেন এসব তথ্য অস্বীকার করেছিলেন, এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাইলে ইশরাক দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগে সেটিকে অসত্য বা গুজব হিসেবেই ধরে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তিনি কখন জানতে পেরেছিলেন, কেন আগের রাতের খবরকে ‘মিথ্যা’ বলেছিলেন এবং পদত্যাগের উদ্যোগ আসলে কার ছিল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি তাঁর বক্তব্যে। এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইশরাক বলেন, ‘সকালের মেসেজ কী গেল, বিকেলের মেসেজের কমা একটা ঠিক ছিল না, দাড়িটা কম হইছে—এগুলা নিয়ে দয়া করে মূল প্রসঙ্গ থেকে আমাদেরকে সরাবেন না।’।
দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আজকের দিন হতে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ঢাকা-৬ আসনের এলাকায় মাদক নির্মূল ও জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করার অনুমতি চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে, যা তিনি অনুমোদন করেছেন।
তবে ভিন্ন তথ্য বলছে, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ডেকে নিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, সকালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা বলা হলেও দুপুরে কেন স্বেচ্ছায় অব্যাহতির কথা বলছেন। জবাবে ইশরাক বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কথা বললেও অফিশিয়ালি কিন্তু তাঁর নির্দেশই আসবে। উনি ক্যাবিনেটের প্রধান, উনি নির্দেশই দিবেন।’ সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিতও করেছিল।
পদত্যাগের কারণ প্রসঙ্গে ইশরাক দাবি করেন, দলের একজন সহকর্মী নির্ধারিত সময়ের আগে সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গতকাল হয়েছে না আজকে হয়েছে, তাতে কী আসে–যায়?’ তাঁর মতে, এই বিভ্রান্তি মূল প্রসঙ্গের চেয়ে বড় নয়। অথচ আগের রাতে তিনি পদত্যাগের নির্দেশকে কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্য হিসেবে দাবি করেছিলেন, যা সোমবারের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সোমবার সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেসক্লাব চত্বরে নেতা-কর্মীদের সামনে গিয়ে ইশরাক পুনরায় বলেন, ‘আমি আজকে পদত্যাগ করলাম আমার এই পদ থেকে।’ এর আগে রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, মন্ত্রিপরিষদের যেকোনো সদস্যের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এলে তা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশের খবর প্রকাশের সময় তিনি তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা গোটা ঘটনাপ্রবাহে এক অদ্ভুত অস্বচ্ছতা তৈরি করেছে।