দিল্লির যন্তর মন্তরকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ ও আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস হুমকির মুখে। মোদি সরকার এই স্থানটিকে আন্দোলনকারীদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় ভারতীয় গণতন্ত্রের এক বিশেষ অধ্যায় অবসানের পথে। রাজস্থানের জয়পুরের মহারাজা সোয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) ১৭২৪ থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করেছিলেন। জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারানসি ও মথুরার মতো দিল্লিতেও তিনি মানমন্দির স্থাপন করেন। উদ্দেশ্য ছিল সূর্য, চাঁদ ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি ও সময় নিরূপণ করা। লক্ষণীয়, ইউরোপের জেসুইট মিশনারিদের চোখে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওরা তখন ধর্মদ্রোহী। সূর্য, চাঁদ ও মহাবিশ্বের মহাকাশের অজস্র গ্রহ–নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, পৃথিবীর ওপর তাদের প্রভাব, সঠিক সময় ও কাল নির্ধারণ ছিল ওই মানমন্দিরগুলো স্থাপনের উদ্দেশ্য। মথুরার মানমন্দিরটি বিলুপ্ত হলেও বাকি চার শহরে আজও তা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। আর আছে ‘রাম যন্ত্র’, যা দিয়ে বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের অবস্থান, উচ্চতা ও দিগংশ পরিমাপ করা হয়। ‘জয়প্রকাশ যন্ত্র’ দিয়ে সূর্য কোন রাশিচক্রে অবস্থান করছে দেখা হয়। ‘সম্রাট যন্ত্র’ সূর্যের আলো ও ছায়ার গতিবিধি দেখে সঠিক সময় নির্ধারণ করে। সেই জলাধারে প্যাডেল নৌকা চালানোর বন্দোবস্ত ছিল। পরিবার নিয়ে ছুটির দিনে মানুষ নৌকা চড়ার সাধ মেটাতেন। রাজপথের ওপর ও বোট ক্লাবের সর্বত্র তাঁবু খাটিয়ে, ট্রাক্টর ও গরুর গাড়িতে সংসার পেতে কৃষকেরা এক সপ্তাহ অবস্থা করেছিলেন।
‘যন্তর’ শব্দের অর্থ যন্ত্র বা হাতিয়ার এবং ‘মন্তর’ এসেছে ‘মন্ত্র’ বা ‘মন্ত্রণা’ থেকে। অর্থাৎ যন্তর মন্তর মূলত গ্রহ-নক্ষত্রের সামঞ্জস্য পরিমাপের একটি কেন্দ্র। এখানকার ‘সম্রাট যন্ত্র’, ‘জয়প্রকাশ যন্ত্র’, ‘রাম যন্ত্র’ এবং বিশাল ‘সানডিয়াল’ বা রোদ্দুর ঘড়িসহ মোট ১৩টি স্থাপত্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল হিসাব মেলায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১৯০১ সালে মহারাজা রাম সিং এর সংস্কার করেছিলেন। স্বাভাবিক প্রশ্ন, এই মানমন্দিরগুলোর নাম যন্তর মন্তর কেন। যন্ত্র হলো সেই বস্তু, যা কাজে ব্যবহৃত হয়। একার্থে তা হাতিয়ারও বটে। ‘মন্তর’ শব্দটি ‘মন্ত্রণা’ বা ‘মন্ত্র’র অপভ্রংশ।
নব্বইয়ের দশকের আগে দিল্লির আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ‘বোট ক্লাব’। রাজপথের পাশে অবস্থিত এই এলাকাটি আগে কিংসওয়ে নামে পরিচিত ছিল। রাষ্ট্রপতি ভবন, নর্থ ও সাউথ ব্লক এবং সংসদ ভবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বোট ক্লাব ছিল শাসককে চ্যালেঞ্জ জানানোর শ্রেষ্ঠ জায়গা। ১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে লাখো কৃষকের ৩৫ দফা দাবিতে বিশাল আন্দোলন রাজীব গান্ধীর সরকারকে কোণঠাসা করেছিল। পরে বোফর্স কেলেঙ্কারিসহ নানা বিতর্কে বোট ক্লাবে হওয়া কংগ্রেসবিরোধী সমাবেশই বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করেছিল। ভুলে যেতে হবে গণতন্ত্র ও আন্দোলনের সমান্তরাল অবস্থানের কথা। তার সামনের প্রশস্ত পথ এসে মিশেছে বিজয় চকে। রাষ্ট্রপতি ভবনের অভ্যন্তরের ‘মোগল গার্ডেন’–এর নাম যেমন হয়েছে ‘অমৃত উদ্যান’, তেমনই রাজপথের নাম বদলে হয় ‘কর্তব্য পথ’। বোট ক্লাব ও রাজপথে উঠে এসেছিল উত্তর ভারতের গ্রাম। বোফর্স, ফেয়ারফ্যাক্স, সাবমেরিন, কাটমানি, ঘুষের অভিযোগে সরকারকে জেরবার করে তোলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং।
তবে ১৯৯৩ সালে সরকার বোট ক্লাবকে আন্দোলনমুক্ত ঘোষণা করলে বিক্ষোভকারীদের নতুন ঠিকানা হয় যন্তর মন্তর। মেধা পাটকরের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর লড়াই, কিংবা আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন—যন্তর মন্তর দেখেছে অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে। ২০১৫ সালে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের ‘এক পদ এক পেনশন’ দাবি বা ২০১৭ সালের তামিলনাড়ুর কৃষকদের ৪১ দিনের অনশনও এখানে হয়েছে। নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৩ সালে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে অলিম্পিক পদজয়ীদের বিক্ষোভও এই স্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে। ১৯৯১ সালের মে মাসে লোকসভা ভোট চলাকালে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে নিহত হন রাজীব গান্ধী। তার ঠিক আগের দিন শেষ হয়েছে প্রথম দফার ভোট গ্রহণ।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘ককরোচ জন পার্টি’ (সিজেপি)-র আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্মানে আঘাত হেনেছিল। দীর্ঘ ১২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে যা কখনো ঘটেনি, সেই বাধ্যবাধকতায় মোদি সরকারকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা নিশ্চিত করতে হয়েছিল। এই ‘তেলাপোকাদের’ দাপট ঠেকাতেই সরকার যন্তর মন্তরে আন্দোলন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রের এই জায়গায় কোনো ধরনের বিক্ষোভ করা যাবে না। পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের জন্য রামলীলা ময়দান, সিবিডি গ্রাউন্ড ও বুরারির ময়দানকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা কেন্দ্র থেকে যথাক্রমে ৪, ১২ ও ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যন্তর মন্তর যে লন্ডনের হাইড পার্কের মতো গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের সমার্থক হয়ে উঠেছিল, তা এখন চূড়ান্ত পরিণতির অপেক্ষায়। দিল্লির যন্তর মন্তর সত্যি সত্যিই যদি বিক্ষোভকারী ও আন্দোলনকারীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অধ্যায়ের অবসান ঘটবে। রাইসিনা হিলসের এক প্রান্তে অবস্থিত ভারতের রাষ্ট্রপতির বাসভবন। সেখান থেকে শুরু হয়ে যে রাস্তাটি কোনো দিকে না বেঁকে সোজা চলে গেছে ন্যাশনাল স্টেডিয়াম পর্যন্ত, ব্রিটিশ জমানায় পৌনে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ওই সড়কের নাম ছিল ‘কিংসওয়ে’। ওই পথের দুই ধারের সবুজ লন ও তারই পাশে টানা লম্বা অগভীর জলাধার, যা ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত বিস্তৃত। পরের বছরই ঘনিয়ে উঠেছিল রাজীব গান্ধী ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংকট।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আদালত যদি সরকারের এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেয়, তবে ক্ষমতার অলিন্দের সামনে আর কখনোই সাধারণ মানুষ তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে জড়ো হতে পারবে না। শাসনক্ষমতার একেবারে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সুযোগ বন্ধ হওয়া ভারতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।